শনিবার ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নীলার দংশনে নীল পূর্বাচল

প্রকাশিত : 10:14 AM, 2 August 2022 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

রাজধানীর অদূরেই পূর্বাচল নতুন শহর। ওই শহরে পা ফেললে একটা নাম মানুষের মুখে ফেরে। তিনি নীলা! পুরো নাম সৈয়দা ফেরদৌসী আলম। রূপগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান, পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। জমি দখলসহ নানা অবৈধ কাজে তাঁর দাপট আর প্রভাব খাটানোর ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও পূর্বাচল-রূপগঞ্জের কেউ প্রতিবাদ তো দূরের কথা- কিছু বলতেও সাহস পান না। পূর্বাচলের ‘নীলা মার্কেট’ গণমাধ্যমে এতবার শিরোনাম হয়েছে যে এখন মার্কেটটি একনামে চেনে সবাই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট দখল করে নীলা দাঁড় করিয়েছেন ওই মার্কেট। এর পাশেই প্লট দখল করে বানিয়েছেন ক্লাব। ক্লাবের পিলে চমকানো নাম ‘আওয়ামী লীগ ক্লাব’!

নীলার স্বামী শাহ আলম ফটিক আর দেবর আনোয়ার হোসেন ক্লাবটির দেখভাল করেন। পূর্বাচলে প্রতিবন্ধীদের খেলার জায়গা দখল করে বানিয়েছেন লেডিস ক্লাব, পূর্বাচল কনভেনশনের ৭৬ কাঠার প্লট এখন তাঁর কবজায়, পূর্বাচল ক্লাবের সদস্যপদ কেনাবেচা হয়, শীতলক্ষ্যার তীরে প্লট দখল করে চলছে কয়লা-পাথর-বালুর কারবার, মন্দির-শ্মশানের প্লটে উঠিয়েছিলেন দোকান আর ইউসুফগঞ্জ খালের ওপর উঠেছে নীলার বাড়ি। ক্ষমতার দাপটে স্থানীয় ইউসুফগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদ নীলা আঁকড়ে রেখেছেন এক যুগ। প্রতিবন্ধীদের খেলার জায়গায় লেডিস ক্লাব :পূর্বাচল ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩০৫ নম্বর রোডে প্রায় তিন বিঘা জমি প্রতিবন্ধীদের খেলার মাঠ হিসেবে সংরক্ষণ করেছিল রাজউক।

ওই প্লটের দুই বিঘা নীলা দখল করে তৈরি করেছেন পূর্বাচল লেডিস ক্লাব। চারপাশে সীমানা দিয়ে ভেতরে
বানানো হয়েছে সুইমিংপুল, অফিসকক্ষ, ব্যায়ামাগারসহ কয়েকটি অবকাঠামো। নীলা নিজেই ক্লাবের সভাপতি। ক্লাবটির সদস্যপদ বিক্রি চলছে তিন লাখ টাকায়। আজীবন সদস্যপদ চার লাখ; আর দাতা সদস্যপদ বেচাকেনা হচ্ছে ছয় লাখ টাকায়। এরই মধ্যে ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২০০। ক্লাব তদারকির দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদকের কাছে সদস্যপদ কেনার ব্যাপারে কথা বলতে নীলার স্বামী শাহ আলম ফটিকের মোবাইল ফোন নম্বর দেন। ফোন করা হলে শাহ আলম বলেন, ‘এটা এখন আর আমি দেখছি না। এ দায়িত্ব রিয়াকে দেওয়া হয়েছে।’ পরে ফোনে যোগাযোগ করলে পূর্বাচল লেডিস ক্লাবের সেক্রেটারি তাহরিয়া আলম রিয়া কিছু বলতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে ফেরদৌসী আহমেদ নীলা বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের জায়গা দখল করিনি। পাশের একটি আবাসিক প্লট আমার বাবার। সেটাতে ক্লাবের কার্যক্রম চলছে।’ আবাসিক প্লটে ক্লাব কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপাতত এখানে চলছে। ওই সড়কেই ক্লাবের জন্য জায়গা নেওয়া হয়েছে। পরে সেখানে স্থানান্তর হতে পারে।’ তবে পূর্বাচলের সাবেক প্রকল্প পরিচালক উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, ‘পূর্বাচল লেডিস ক্লাব নামে কোনো জায়গা রাজউক বরাদ্দ দেয়নি। যদি এটা কেউ করে, তাহলে উন্মুক্ত স্থান বা অন্যের প্লট দখল করে করা হয়েছে।’ রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, ‘এই নীলার নাম আমি আরও অনেক শুনেছি। তাঁর কিছু স্থাপনা বিভিন্ন সময় উচ্ছেদও করেছে রাজউক। প্রতিবন্ধীদের খেলার জায়গা দখল করে ক্লাব করলে সেটাও উচ্ছেদ করা হবে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, লেডিস ক্লাবের পাশেই ১০ কাঠার মতো আয়তনে প্রতিবন্ধীদের খেলার জায়গা হিসেবে একটি সাইনবোর্ড আছে। স্থানীয়রা জানান, ক্লাবের জায়গার প্রায় পুরোটাই প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ ছিল। কনভেনশন সেন্টারের প্লট :২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে একটি কনভেনশন সেন্টারের জন্য জমি বরাদ্দের আবেদন করেন কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া, মোজাহারুল হক ও হুমায়ুন কবির। ওই বছরের ২৩ নভেম্বর প্লটের জামানতের ১৫ লাখ টাকাও জমা দেন তাঁরা। বোর্ড সভায় অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর ১ নম্বর সেক্টরের ২০৪ নম্বর রোডের ৩ নম্বর প্লটটি কনভেনশন সেন্টারের জন্য বরাদ্দ দেয় রাজউক। প্লটের আয়তন ৭৬ দশমিক ৮৩ কাঠা। প্লটটির বর্তমান বাজারদর প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

বরাদ্দ পেয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির ১০ কোটি টাকা জমা দেন সংশ্নিষ্টরা। বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা হঠাৎ জানতে পারেন, ফেরদৌসী আলম নীলা ‘পূর্বাচল নীলা কনভেনশন লিমিটেড’ নাম দিয়ে ওই প্লটটি দখল করে নিয়েছেন। আর রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত করে নতুন নামে সেটা রেজিস্ট্রির অনুমতিপত্রও রাজউক থেকে বের করেছেন। পুরো প্লটে দেয়াল দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন নীলা। এর মধ্যেই মূল বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে রাজউকে যান। পূর্বাচল কনভেনশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘নীলা যে কীভাবে এ কাজগুলো করল, আমরা বুঝতেই পারিনি। ঘটনা জানার পর আদালতে মামলা করেছিলাম। আদালত রাজউককে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। রাজউক তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পায়।

তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করলে আদালত এ বিষয়ে নীলার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।’ রাজউকের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য, পূর্বাচল প্রকল্পের সাবেক পরিচালক এবং রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, ‘নীলা দুই-নম্বরি করে এসব কাজ করেছিলেন। আমরা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছি। পাশাপাশি ওই প্লটে তৈরি করা অবকাঠামো ভেঙে দিয়েছি। এখন আর মূল বরাদ্দ পাওয়াদের ওই প্লট পেতে কোনো সমস্যা হবে না।’ উজ্জ্বল মল্লিক আরও বলেন, ‘একবার পূর্বাচলে প্লট দখল করে তিনি নীলা মার্কেট বানিয়েছিলেন। সেটাও একাধিকবার উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ রকম অসংখ্য অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আছে।’ রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, ‘ঘটনাটি আমিও জানি। রাজউকের পক্ষ থেকে মূল মালিকদের প্লটটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা চলছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT