শনিবার ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বন্ধ প্রায় খুলনার সব পাট কল

না খেয়ে দিন কাটছে পাট কল শ্রমিকদের

প্রকাশিত : 02:02 PM, 2 August 2022 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

খুলনা জেলা প্রতিনিধি-
মোঃ মিলন হোসেনঃ-

ক্রিসেন্ট জুট মিলের তাঁত বিভাগে ৩৫ বছর চাকরি করেছেন শ্রমিক আবুল কালাম। পাটকলটি বন্ধের পর থেকে রিকশা চালিয়ে কোনোমতে চলে তাঁর সংসার। স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ভাড়া থাকেন খালিশপুর মানষী বিল্ডিং মোড়ের একটি ছোট্ট ঘরে। আবুল কালাম বলেন, দুই ছেলে একটি খাবারের দোকানে কাজ করে, ছোট ছেলে স্কুলে পড়ে। অর্থের অভাবে মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মিল বন্ধের পর ৬ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। তা দিয়ে দেনা শোধ করে মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু টাকা রেখে দিয়েছি। মিলের চাকরি শান্তির ছিল। এখন রোদ-বৃষ্টিতে রিকশা চালাই। আশায় আছি আবার কবে মিল চালু হবে।’

পার্শ্ববর্তী প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক সাহেব আলীর ৫৫) সঙ্গে কথা হয় মিল কলোনির ২ নম্বর গেটের সামনে চায়ের দোকানে বসে। তিনি বলেন, ৩৪ বছর চাকরি করেছি। মিল চালু থাকা অবস্থায় শ্রমিকরা সুখে ছিলেন। এখন কষ্টে দিন যাচ্ছে। যাঁদের চাকরি না থাকে, তাঁদের দিন কেমন যায় তাঁরাই বোঝেন। মিলের কাছে এখনও কিছু টাকা পাওনা আছে। তিনি বলেন, ‘মিল বন্ধের পর পরিবারের সদস্যদের গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে গ্রামের বাড়ি রেখে এসেছি।

আমি একা খুলনায় থাকি। কিছু সঞ্চয় ছিল এর লভ্যাংশ দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। এখন ঘুরি ফিরি খাই। দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ দিতে কষ্ট হচ্ছে। মিল চালু হলে ভালো হয়।’ শুধু এই দু’জনই নন, তাঁদের মতো খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের চাকরিহারা অর্ধলাখ শ্রমিক-কর্মচারীর পরিবার কষ্টে রয়েছে। লোকসানের কারণ দেখিয়ে ২০২০ সালের ২ জুলাই রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম, যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিল বন্ধ করে দেয় সরকার। লিজের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করে তিন মাসের মধ্যে মিলগুলো আবার চালু করার ঘোষণা দিয়েছিল বিজেএমসি। কিন্তু একটি মিলও চালু হয়নি। শ্রমিকরা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। চাকরিহারা শ্রমিকদের কেউ কেউ অন্য পেশায় ঢুকলেও অনেকের জোটেনি কোনো কাজ। দীর্ঘদিন ধরে মিলের যন্ত্রপাতি অব্যবহূত থাকায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় লোকজন ও কর্মহীন শ্রমিকরা জানান, খালিশপুর ও আটরা শিল্প এলাকার পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ দুটি শিল্প এলাকার বহু মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে।

বিভিন্ন জেলা থেকে যেসব লোক কাজের জন্য এ দুটি এলাকায় এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই সপরিবারে নিজ জেলায় ফিরে গেছেন। বন্ধ হয়ে গেছে মিল-কারখানাকেন্দ্রিক অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য ও দোকানপাট। ফলে নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে এ দুটি শিল্প এলাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. খলিলুর রহমান বলেন, সব শ্রমিক এখনও তাঁদের বকেয়া টাকা পাননি। অধিকাংশ শ্রমিকের নতুন কর্মসংস্থানও হয়নি। চাকরিহারা পাটকল শ্রমিকরা কেউই ভালো নেই। মিল আবার চালু করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তাতে অগ্রগতি হচ্ছে না। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের কারণে বিভিন্ন জেলার যেসব লোক খালিশপুরে বসবাস করত এর অর্ধেকেরও বেশি লোক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এলাকা ছেড়েছেন।

তিনি বিআইডিসি সড়ক দেখিয়ে বলেন, এই সড়কটির আলমনগর মোড় থেকে নতুন রাস্তা মোড় পর্যন্ত দোকানপাটের অর্ধেকের বেশি বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় মার্কেট ও কাঁচাবাজারগুলোতে ক্রেতা কমে গেছে অনেক। ক্রিসেন্ট জুট মিল সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন বলেন, খালিশপুর ও আটরা শিল্প এলাকা এখন নিষ্প্রাণ। কর্মহীন দিন কাটছে হাজার হাজার শ্রমিকের। ভাটা পড়েছে এলাকায় কাজকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না অনেক বাড়ির মালিক। খাঁ খাঁ করছে শ্রমিক কলোনিগুলো। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিআইডিসি সড়কে দৌলতপুর, প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট ও খালিশপুর জুট মিল গেট এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়িতে ‘টু-লেট’ লেখা সাইনবোর্ড ঝোলানো। সড়কটিতে আগের মতো যানবাহন ও লোক চলাচল নেই। প্লাটিনাম জুট মিল শ্রমিক কলোনিতে ঢুকে দেখা যায়, শ্রমিকদের বসবাসের বেশিরভাগ ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিজেএমসির খুলনা অঞ্চলের সমন্বয়কারী মো. গোলাম রব্বানী বলেন, পাটকলগুলো লিজ দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ক্রিসেন্ট জুট মিল লিজ নিতে একটি প্রতিষ্ঠান টাকা জমা দিয়েছে, আরও কিছু টাকা বাকি আছে। প্লাটিনাম, দৌলতপুর ও জেজেআই জুট মিল লিজ নিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে টাকা জমা দিতে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। তারা টাকা জমা দেওয়ার পর তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হবে। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এই চারটি পাটকল পুনরায় চালু করতে আরও দেড় মাসের মতো লাগতে পারে। অন্য পাঁচটি পাটকল লিজ দিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও আশানুরূপ দর পাওয়া যায়নি। সে কারণে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে। শ্রমিকদের বেশিরভাগ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।কিছু টাকা বকেয়া আছে, সেগুলো পরিশোধের চেষ্টা চলছে

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT